প্রায় ছ’দশকের বসতি। সেই বসতিতেই আচমকা বন্ধ পুরসভার পানীয় জল। কোনও আগাম নোটিস নেই, নেই সতর্কবার্তা কিংবা বাসিন্দাদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ। জল বন্ধের পর সামনে আসে আরও বড় আশঙ্কা, উচ্ছেদ! এই জটিল পরিস্থিতিতে জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়াল কলকাতা হাইকোর্ট। আপাতত বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে কোনও জোরপূর্বক পদক্ষেপ করা যাবে না বলে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিল আদালত।
রাজ্যের পালাবদলের পরেই প্রায় ৬০০ টি পরিবারের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। দিশাহীন পরিস্থিতিতে কোথায় জানাবে তাঁদের অভাব অভিযোগ। কারণ তাঁদের জন্য সব রাস্তাই বন্ধ। একদিকে অস্তিত্বের সংকট, অন্যদিকে পানীয় জলের সমস্যা। পূরসভায় জানিয়েও হয়নি কোনো সুরাহা। শেষমেশ তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
কলকাতা পৌরসভার অধীনে জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দা জাহানারা বিবি-সহ আবেদনকারীদের দায়ের করা মামলায় চলতি সপ্তাহে এই নির্দেশ দেন বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়। আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষকে ওই নির্দেশ মেনে চলতে হবে।
আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তব্য, সরকারি সম্পত্তি অবৈধ দখলমুক্ত আইন, ১৯৭১-এর কয়েক জন অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে সেই ধরনের কোনও পৃথক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। অথচ ওই নির্দেশের সুযোগ নিয়ে তাঁদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
রাজ্যের আইনজীবী লোকনাথ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য এই দাবি জোরালো ভাবে বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য, আবেদনকারীরা ঠিক কোন অংশে বসবাস করছেন বা তাঁদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তবে আবেদনকারীদের বক্তব্যে গুরুতর বিষয় রয়েছে বলেই মনে করে আদালত। অন্তর্বর্তী সুরক্ষা না দিলে আবেদনকারীরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, এই বিষয়টি বিবেচনা করে বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় জোরপূর্বক পদক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে জ্যোতিনগর কলোনির জল-বঞ্চনার অভিযোগও। কাশিপুর বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পি-১২/৬, স্ট্র্যান্ড ব্যাঙ্ক রোডের কলোনির বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৬০ বছর ধরে তাঁরা সেখানে বসবাস করছেন। পুরসভার জল-সহ বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবাও পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু গত ২৯ জুলাই রাতে কোনও পূর্ব নোটিস বা প্রশাসনিক যোগাযোগ ছাড়াই আচমকা জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
পানীয় জল, রান্না, পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন,দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। পরে বাসিন্দারা জানতে পারেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট, কলকাতার এস্টেট অফিসার একটি উচ্ছেদ সংক্রান্ত চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী অন্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
আইনজীবি শামিম আহমেদ ও আইনজীবি মহম্মদ নাসিরুল হক জানান,ওই মামলায় তাঁরা কেউই পক্ষ ছিলেন না। তাঁদের কোনও নোটিস দেওয়া হয়নি, শোনা হয়নি তাঁদের বক্তব্যও। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ভাবে উচ্ছেদ বা অন্য কোনও পদক্ষেপ করা হলে তা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হবে।আবেদনে সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বাসিন্দাদের যুক্তি, পানীয় জল কোনও বিলাসিতা নয়, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই কোনও নোটিস বা শুনানির সুযোগ না দিয়ে জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলে তা নাগরিকের জীবন ও মর্যাদার অধিকারের প্রশ্নও তুলতে পারে।
জ্যোতিনগর কলোনিতে ছ’দশকের পুরনো বসতি। আচমকা জল বন্ধ। তার পর উচ্ছেদের আশঙ্কা। আর যে উচ্ছেদ নির্দেশকে ঘিরে আতঙ্ক, সেই প্রক্রিয়াতেই বাসিন্দাদের বক্তব্য শোনা হয়নি,এই অভিযোগই এখন কলকাতা হাই কোর্টের দরজায়। আপাতত আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্বস্তি জাহানারা বিবি-সহ আবেদনকারীদের। আগামি ২৪ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানি। বাসিন্দাদের আশা, হয়তো সেখানেই মিলবে কোনো সুরাহা।
Leave a Comment