---Advertisement---

অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত, বিদেশে পাচার শত শত কোটি টাকা

By Suman Debnath

August 8, 2026 1:35 PM

অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত, বিদেশে পাচার শত শত কোটি টাকা

---Advertisement---


মুঠোফোনে কয়েকটি ক্লিক, আর অল্প সময়েই দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা—অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এমন লোভনীয় প্রচারণায় আকৃষ্ট হচ্ছেন দেশের বহু মানুষ। শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর অভিযোগ রয়েছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনলাইন বেটিং ঘিরে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ নেটওয়ার্কে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) থেকে শুরু করে ক্রিপ্টোকারেন্সি পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি।


ফলে বিষয়টি এখন শুধু জুয়ার আসক্তি বা ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের মতো গুরুতর বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।



অনলাইন জুয়ার চক্রগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে দ্রুত ও বড় অঙ্কের লাভের প্রতিশ্রুতি দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে কয়েক গুণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রচারণা চালানো হয়।


তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নতুন ব্যবহারকারী প্রথমদিকে কিছু অর্থ লাভ করলে তার মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। পরে তাকে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা আটকে যাওয়ার পর অনেক ব্যবহারকারী আর তা ফেরত পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।


এভাবে কেউ কেউ ঋণ করে, সঞ্চয় ভেঙে কিংবা প্রয়োজনীয় সম্পদ বিক্রি করেও অনলাইন জুয়ার পেছনে অর্থ ব্যয় করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।



অনলাইন জুয়ার আর্থিক লেনদেনে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট নম্বর ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।


সাইবার নজরদারিতে বিপুলসংখ্যক এমএফএস নম্বর শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব নম্বরের মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেনের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।


তদন্তকারীদের মতে, দেশে অর্থ সংগ্রহের পর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করার একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।



গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তদন্তে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি চক্রের মূল ব্যক্তিদের বিদেশে অবস্থানের তথ্য পাওয়ার কথা জানা গেছে।


তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, কেউ কেউ নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে অনলাইন বেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দেশের ভেতরে তাদের হয়ে কাজ করছে মাস্টার, সুপার ও সাব-এজেন্টদের একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো।


এই ব্যবস্থায় চক্রের এক স্তরের সদস্যের সঙ্গে অন্য স্তরের সদস্যের সরাসরি যোগাযোগ বা পরিচয় সবসময় থাকে না। কমিশনের ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহ, অ্যাকাউন্ট পরিচালনা ও ব্যবহারকারীদের লেনদেনের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন:  শহীদ পরিবারসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ল



অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্কে প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন থাকায় আইটি বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন তরুণদের একটি অংশ সাব-এজেন্ট হিসেবে যুক্ত হচ্ছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ।


তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কম্পিউটার সায়েন্সের পড়াশোনা শেষ করতে না পারা বা প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কর্মসংস্থান না পাওয়া কিছু তরুণ সহজ আয়ের আশায় এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন।


শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ করলেও পরে দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে কেউ কেউ বড় পরিসরে সাইট বা এজেন্ট নেটওয়ার্ক পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।



গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অনেক অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের সার্ভার দেশের বাইরে রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রাশিয়া, সাইপ্রাস ও চীনসহ কয়েকটি দেশে এসব সাইটের সার্ভার থাকার তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।


কিছু প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া থেকেও পরিচালিত হওয়ার তথ্য তদন্তে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।


দেশের ভেতর থেকে সাইটগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিদেশি সার্ভার ও সীমান্তপারের পরিচালন কাঠামোর কারণে আইন প্রয়োগে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।



তদন্তে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার চক্রগুলো শুধু প্রচলিত যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে না। অর্থ লেনদেন ও এজেন্টদের মধ্যে যোগাযোগ সমন্বয়ের জন্য টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।


কেউ প্রথমে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আস্থা অর্জন করতে পারলে নিজস্ব ব্র্যান্ড বা সাইট পরিচালনার সুযোগ পাওয়ার ঘটনাও তদন্তে এসেছে বলে জানা গেছে।


এভাবে একটি ছোট নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে বড় আকারের বেটিং চক্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।



গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বিপুল অর্থ উপার্জন করে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। বিপরীতে তাদের তৈরি করা নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের একটি অংশ বড় অঙ্কের অর্থ হারাচ্ছেন।


সাইবার নজরদারির মাধ্যমে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করে গত বছর কয়েকজনকে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করে কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।


সম্প্রতি আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। তাদের আর্থিক লেনদেন ও অনলাইন কার্যক্রম তদন্ত করে নেটওয়ার্কের বিস্তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।


বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সহজে অনলাইনে প্রবেশের সুযোগ, দুর্বল সচেতনতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা—সব মিলিয়ে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, প্রলোভন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি থাকলে এ ধরনের অপরাধ আরও বিস্তৃত হতে পারে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন:  বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণকে 'ইতিবাচক' আখ্যা ভারতের


সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফউদ্দীন শাহীন জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে ২৪ ঘণ্টা সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।


তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সম্প্রতি একাধিক মামলা হয়েছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে নতুন বেটিং সাইট শনাক্ত করে সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।


অন্যদিকে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, অনেক ভুক্তভোগী ক্ষতির পরও আইনি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখান না, যা তদন্তে একটি বড় বাধা।


অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর আন্তর্জাতিক চরিত্র। একটি সাইট বন্ধ হলেও নতুন নামে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম চালু হতে পারে। দেশের বাইরে সার্ভার ও পরিচালনাকারীরা অবস্থান করলে তাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।


তাই শুধু ওয়েবসাইট ব্লক বা কয়েকজন এজেন্ট গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। একই সঙ্গে অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা, অবৈধ এমএফএস লেনদেন বন্ধ করা, সাইবার নজরদারি বাড়ানো এবং বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।


অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় সামাজিক ক্ষতির একটি হলো তরুণদের এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়া। দ্রুত অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের একটি অংশকে ধীরে ধীরে জুয়ার নেটওয়ার্কে ঢুকিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।


একবার আসক্তি তৈরি হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি, ঋণের বোঝা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের পক্ষ থেকে অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।


অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য সাইবার নজরদারি, আর্থিক লেনদেনের কঠোর পর্যবেক্ষণ, দ্রুত তদন্ত এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা। কারণ একটি ক্লিকের মাধ্যমে শুরু হওয়া জুয়ার খেলা অনেকের জন্য শেষ হতে পারে সঞ্চয় হারানো, ঋণের বোঝা কিংবা পুরো পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ে।



---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment