বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে ১৯টি। বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি, যেখানে ২০১৪ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ১০৬।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১১৪টিতে পৌঁছায়। সর্বশেষ হিসেবে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১৭টি বাঘের উপস্থিতি রয়েছে।
সংখ্যা বাড়লেও উদ্বেগ কমেনি
সংরক্ষণ কার্যক্রমের কারণে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, গত কয়েক বছরে শিকার, ফাঁদ, বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঘ মারা গেছে।
সংরক্ষণকর্মীদের মতে, হরিণ শিকারিদের অবাধ তৎপরতা এবং বনদস্যুদের কার্যক্রম বাঘের স্বাভাবিক আবাসস্থলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। সম্প্রতি শিকারিদের পাতা ফাঁদে একটি বাঘ আটকা পড়ার ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
খাদ্য ও আবাসস্থল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
গবেষকদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের জন্য ৬০ থেকে ১৫০ বর্গকিলোমিটার এবং একটি স্ত্রী বাঘের জন্য ২০ থেকে ৬০ বর্গকিলোমিটার নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র প্রয়োজন। তবে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশেষ করে হরিণ ও বুনো শূকর থাকলে তুলনামূলক ছোট এলাকাতেও বাঘ টিকে থাকতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড়, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এবং খাদ্যের সংকট বাঘের প্রজনন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে কয়েকটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা।
বন উজাড় ও অবৈধ দখল রোধে কঠোর নজরদারি।
চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান।
ক্যামেরা ট্র্যাপ ও রেডিও কলারের মাধ্যমে বাঘের চলাচল পর্যবেক্ষণ।
মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ সীমিত করে নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার
পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ধারাকে ধরে রাখতে হরিণ পাচার ও বন্যপ্রাণী শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩৫ জন সন্দেহভাজন হরিণ পাচারকারীর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বনদস্যু দমন, শিকারবিরোধী অভিযান, আহত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
সম্প্রতি শিকারিদের ফাঁদে আহত একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে দীর্ঘ চিকিৎসার পর আবারও সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে, যা সংরক্ষণ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঘের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের অন্যতম ‘কিস্টোন স্পিসিজ’ বা প্রধান প্রজাতি। এই প্রাণীটির অস্তিত্ব পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাদের মতে, বাঘ সংরক্ষণ মানেই শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখা। তাই বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারাকে ধরে রাখতে সরকার, বন বিভাগ, গবেষক এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
Leave a Comment