সিকিমের নামচি (Namchi) জেলায় তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২০। এখনও পাঁচজনের কোনও খোঁজ মেলেনি। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সেনাবাহিনী, পুলিশ, দমকল ও NHPC-র বিশেষজ্ঞ দল দিনরাত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। মৃতদের বড় অংশই উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা হওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায়।
সোমবার দুপুরে নামচির সামারদুং এলাকায় NHPC-র তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ টানেলে আচমকাই ধস নামে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভিতরে আটকে পড়েন একাধিক শ্রমিক ও প্রকল্পের কর্মী। প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান, সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণের পরেই ধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। যদিও প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করা হবে।
দুর্ঘটনার সময় অন্তত ২৭ জন শ্রমিক সুড়ঙ্গের গভীরে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে একে একে ২০ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গের ভিতরের প্রতিকূল পরিস্থিতি। ধ্বংসস্তূপের পাশাপাশি মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের অনেকেই টানেলের ভিতরে প্রবেশ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কয়েকজন সাময়িকভাবে জ্ঞানও হারান বলে জানা গিয়েছে।
এর পাশাপাশি বারবার ধস নামার আশঙ্কা, কাদা ও বিশাল পাথরের স্তূপ এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গায় কাজ করতে হওয়ায় উদ্ধার অভিযান ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, মৃত ২০ জনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নয়জন জলপাইগুড়ির, দু’জন আলিপুরদুয়ারের, একজন পাঞ্জাবের এবং একজন সিকিমের বাসিন্দা। জলপাইগুড়ির মৃত শ্রমিকদের অধিকাংশই মেটেলি ও বিন্নাগুড়ি এলাকার। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি কেরলের ভূতত্ত্ববিদ অনীশ মোহন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে মৃত ও নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের সিকিমে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছে প্রশাসন। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দিতে সব ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং ট্রাফিক বিভাগের ডিএসপিও।
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং (Prem Singh Tamang) উদ্ধার অভিযানের উপর নিয়মিত নজর রাখছেন। মৃতদের পরিবারপিছু ৪ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছে সিকিম সরকার। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং কেন্দ্রের তরফে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে।
NHPC জানিয়েছে, আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে। সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুরো অভিযান তদারকি করছেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত তদন্তও শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং সুড়ঙ্গ ধসের কারণ অনুসন্ধানে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। উদ্ধারকারীদের আশা, প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধান মিলবে। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং ধসের অব্যাহত ঝুঁকির কারণে অভিযান এখনও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
Leave a Comment