---Advertisement---

কমিশনে ‘একনায়ক’ হতে চেয়েছিলেন টিএন শেষন, গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টেও: জ্ঞানেশ-বিতর্কে তাড়া করছে অতীতের ভূত

By Suman Debnath

September 25, 2026 6:40 PM

কমিশনে ‘একনায়ক’ হতে চেয়েছিলেন টিএন শেষন, গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টেও: জ্ঞানেশ-বিতর্কে তাড়া করছে অতীতের ভূত

---Advertisement---


জানেন কি, টিএন শেষন (T. N. Seshan) একা হাতে গোটা কমিশন চালাতে চেয়েছিলেন। প্রায় একনাকতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনে। চেয়েছিলেন, তাঁর কথাই শেষ কথা হবে। সেই মামলা তিনি টেনে নিয়ে যান আদালতেও। যদিও সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) স্পষ্ট বলে দেয়, আপনার মর্জিতে কিছু ঘটবে না। একনাকতন্ত্র চলবে না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টের জেরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, সেই প্রেক্ষিতে এখন সেই পুরনো রায়ই নতুন করে তাড়া করছে বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে (Gyanesh Kumar)।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) ছিল প্রায় একজনের হাতেই বাঁধা প্রতিষ্ঠান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই ছিলেন সব। অবশ্য কমিশনও কার্যত একটা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মতোই নিয়মরক্ষার্থে কিছু রুটিন কাজ করত। সেই ছবিটা ক্ষমতা পেয়েই আমূল বদলে দিয়েছিলেন টিএন শেষন। কিন্তু একটা সময়ে তাঁর সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টাই তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে ধমকের পাত্র করে দেয়। তিন দশক পরে সেই পুরনো মামলার ‘সুপ্রিম’ রায়ই এখন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন: জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা, এসআইআর সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের আর্জি

‘একনায়ক’ শেষন?

১৯৯০ সালের ১২ ডিসেম্বর তামিলনাড়ু ক্যাডারের আইএএস অফিসার টিএন শেষন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) পদে বসেন। সংবিধানের ৩২৪ ধারায় নির্বাচন কমিশনকে যে নজরদারি, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার এক নতুন, অনেক বেশি বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেন তিনি। এতদিন যে সব ক্ষমতা আইনে লেখাই ছিল না, শেষন সেগুলোও কমিশনের অধিকার বলে দাবি করেন।

সমস্যা বাধে ১৯৯৩ সালে। কেন্দ্রীয় সরকার আইন সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনকে তিন সদস্যের সংস্থা করে দেয়, আগে যা ছিল একমাত্র মুখ্য কমিশনারের হাতে। শেষন এই পদক্ষেপকে নিজের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা বলে মনে করেন এবং প্রকাশ্যে তার বিরোধিতায় নামেন। বিতর্ক গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।

সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়, যা আজও প্রাসঙ্গিক

১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সংবিধানের ৩২৪ ধারা একটিমাত্র মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখার কথা বলে না, বরং বহু-সদস্যের নির্বাচন কমিশনের কথাই বলে। রায়ে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনাররা কমিশনের পূর্ণ সদস্য, তাঁরা শুধুমাত্র পরামর্শদাতা নন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে প্রতিষ্ঠানের চেয়েও শক্তিশালী বলে তুলে ধরা যায় না এবং বহু-সদস্যের কমিশনের সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত আসলে গোটা কমিশনেরই সিদ্ধান্ত, কোনও এক চেয়ারম্যানের একার নয়। অর্থাৎ, মুখ্য কমিশনার হলেন অন্য কমিশনারদের মতোই একই মর্যাদার। কেমল তাঁর ক্ষেত্রে বলা যায়, তিনি সমানদের মধ্যে প্রথম, তার বেশি কিছু নন। যাকে আইনি পরিভাষায় বলা হয়, প্রাইমাস ইন্টার পারেস (primus inter pares)।

আরও পড়ুন: Explainer: ভোটার তালিকার রাশ তাঁরই হাতে? কমিশনের অন্দরেই তুমুল সংঘাত, কে এই ‘বিতর্কিত’ সীমা খান্না?

জ্ঞানেশ কুমারের মধ্যে শেষনের ছায়া?

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision, সংক্ষেপে SIR) ঘিরে তীব্র বিতর্কের মুখে এখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তে দাবি, গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন, অথচ তাঁদের কথা কানে না তুলেই, তাঁদের অন্ধকারে রেখে সেই সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়েছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী ব্রজেশ সিংহ অ্যাটর্নি জেনারেল আর বেঙ্কটরামানির কাছে চিঠি দিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালত অবমাননার (criminal contempt) প্রক্রিয়া শুরুর অনুমতি চেয়েছেন। তাঁর মূল যুক্তি, শেষন মামলার রায় অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে বহু-সদস্যের সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবেই কাজ করতে হবে, কোনও এক ব্যক্তির ইচ্ছেয় নয়। পূর্ণ কমিশনের নামে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাকি কমিশনারদের পাশ কাটানো হলে তা সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত আইন অমান্য করারই সামিল বলে তাঁর দাবি। এই যুক্তির সঙ্গে জুড়েছে ২০২৩ সালের অনুপ বরণওয়াল মামলার রায়ও, যেখানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছিল।

শুধু এই চিঠিতেই থেমে থাকেনি ব্যাপারটা। মহারাষ্ট্রের কোলাপুর আদালতেও একটি পিটিশন দায়ের হয়েছে, যেখানে রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার আর্জি জানানো হয়েছে। সেই পিটিশনেও হাতিয়ার করা হয়েছে শেষন মামলা এবং এসএস ধানোয়া মামলার রায়কে।

বিরোধীদের চাপ

কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির থেকে ইতিমধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবি উঠেছে, এমনকি ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের (impeachment) সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী শুরু থেকেই জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগে আপত্তি জানিয়ে অসম্মতিপত্র জমা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, অতীতে কংগ্রেস জমানাতেও প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারদের রাজনৈতিক পুরস্কার দেওয়ার নজির রয়েছে, এমনকি শেষন নিজেও পরে কংগ্রেসের টিকিটে ভোটে লড়েছিলেন। কমিশন অবশ্য তাদের অবস্থানে অনড়, তাদের বক্তব্য সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে।

মোদ্দা কথা হল, ইতিহাস যে সবসময় সরলরেখায় চলে না, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে এই তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপড়েনই তার প্রমাণ।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment