---Advertisement---

‘এনাফ ইজ এনাফ, আর রাজপথে বুলেটকে আলিঙ্গন করতে চাই না’

By Suman Debnath

September 24, 2026 1:30 PM

‘এনাফ ইজ এনাফ, আর রাজপথে বুলেটকে আলিঙ্গন করতে চাই না’

---Advertisement---


এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হবে এবং প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন নিজেদের অধিকার আদায়ে আর রাজপথে নেমে জীবন দিতে না হয়, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।


বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহমুদ-উল আমীন অডিটরিয়ামে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের নবীনবরণ-২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বারবার ব্যবস্থাগত পরিবর্তন এসেছে। এখন সেই পরিস্থিতির অবসান প্রয়োজন। তার ভাষায়, ‘এনাফ ইজ এনাফ। আমরা ভবিষ্যতে আর রাজপথে গিয়ে বুলেটকে আলিঙ্গন করতে চাই না।’ এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে হবে, যেখানে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে মানুষ মূল্যায়িত হবে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকার কথা উল্লেখ করে কায়সার কামাল বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিটি পর্যায়েই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনেও তারা রাজপথে সক্রিয় হয়েছেন।


সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ছিল না; বরং একটি ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিকে সামনে রেখেছিল। অতীতে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে অনেকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পেছনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব স্বপ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশাও জড়িয়ে থাকে। কেউ কৃষকের সন্তান, কেউ শিক্ষক, চিকিৎসক বা প্রকৌশলীর পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এসব তরুণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।


নিজের ছাত্রজীবনের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তিনি নিজেও কৃষক পরিবারের সন্তান। তার বাবারও তাকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকায় প্রত্যাশা অনুযায়ী পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।


মুহসীন হলে থাকার সময় দেয়ালে লেখা ‘মানুষ তার আশার সমান বড় হয়’ বাক্যটি তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলেও উল্লেখ করেন কায়সার কামাল। নেত্রকোনার গারো পাহাড়ের পাদদেশের একটি এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের সম্ভাবনাকে কোনো সীমার মধ্যে আটকে রাখা যাবে না।


মেধার বিকাশের জন্য নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ভবিষ্যতে কে কোন অবস্থানে পৌঁছাবেন, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মেধা বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে বলেন।


নবীনবরণ কেবল ফুল দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয় উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এর মধ্য দিয়ে নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর কিছু দায়িত্বও অর্পিত হয়। সেই দায়িত্বের শুরু নিজের প্রতি, এরপর পরিবার, সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতি।


বিসিএস ও সরকারি চাকরির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিসিএস একটি কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার। তবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশের প্রতি দায়িত্বের কথা ভুলে গেলে চলবে না। নিজের ও পরিবারের পাশাপাশি সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও প্রত্যেককে দায়িত্ব পালন করতে হবে।


তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কেউ সামাজিক নেতৃত্বে আসবেন, কেউ গবেষণায় যুক্ত হবেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করবেন। যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, দায়িত্ববোধ ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।


সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশের তুলনায় পরে স্বাধীনতা পেলেও দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা ও পাসপোর্ট পাওয়ার গৌরবের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কতটা অবদান রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্ন করা।


শুধু সরকারের উদ্যোগে দেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলোও আরও বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।


প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণা ও বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বেশি আলোচনায় এলেও দীর্ঘদিনের গবেষণা ও দেশের জন্য করা বিভিন্ন ইতিবাচক কাজ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণা ও কার্যক্রমের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে নবীনদের দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার। তার মতে, ব্যক্তিগতভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। নিজের অর্জিত জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারলেই জীবনের সার্থকতা বাড়ে।


জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রসঙ্গও বক্তব্যে তুলে ধরেন কায়সার কামাল। তিনি জানান, অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কয়েক মাস আগে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন কয়েকজনকে দেখার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন তিনি। তাদের ত্যাগের সঙ্গে মানুষের অধিকার, মেধার মূল্যায়ন এবং সবার জন্য কল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জড়িত বলে উল্লেখ করেন তিনি।


অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শেফালী বেগমসহ বিভাগের শিক্ষক ও নবীন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment