জমি দুর্নীতি মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে তাঁরই প্রাক্তন দুই দেহরক্ষীর বয়ান। সিআইডির দাবি, শালবনিতে উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ সরকারি জমি দখল করে তা জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির চক্র গড়ে উঠেছিল। সেই চক্রের শিকড় বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলেও চার্জশিটে উল্লেখ করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
গত ২ সেপ্টেম্বর শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় চার্জশিট পেশ করে সিআইডি। সেখানে প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরার নাম অভিযুক্ত হিসেবে থাকলেও সুমিত রায়ের নাম অভিযুক্তের তালিকায় নেই। তবে চার্জশিটে মোট ২০ জন সাক্ষীর বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রয়েছেন অভিষেকের দুই প্রাক্তন দেহরক্ষী এবং দুই গাড়িচালক।
সিআইডির দাবি, সাক্ষীদের বয়ান এবং স্থানীয় ভাবে তদন্ত করে জানা গিয়েছে, যে জমি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে, সেটি ছিল সরকারি জমি। উদ্বাস্তুদের চাষাবাদের জন্য সেই জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। অভিযোগ, সুজয় হাজরা, অনিতেশ পাইরা এবং তাঁদের সহযোগীরা ওই জমি দখল করে নেন। তদন্তকারীদের দাবি, গোটা প্রক্রিয়াটি মূলত সুজয় এবং সুমিতের নির্দেশেই চলত।
সুমিতের সঙ্গে স্থানীয় কয়েক জনের আর্থিক লেনদেনেরও হদিস মিলেছে বলে দাবি সিআইডির। তদন্তকারীদের বক্তব্য, জমি জালিয়াতি করে বিক্রির টাকা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সুজয় হাজরা সুমিতের দফতরে পাঠিয়ে দিতেন। অভিষেকের প্রাক্তন দুই দেহরক্ষীও তাঁদের বয়ানে সুমিতের ভূমিকার কথা জানিয়েছেন বলে দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
শুধু দেহরক্ষীরাই নন, সুজয়ের হয়ে কাজ করা দুই দালাল দেবাশিস দে এবং সুব্রত হাজরাও সুমিতের কাছে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। সৈয়দপুর গ্রামের দুই বাসিন্দার কাছ থেকেও সুজয়-সুমিতের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে তথ্য মিলেছে। তদন্তকারীদের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভয়েই এত দিন মুখ খোলেননি স্থানীয়রা।
জমির দলিল নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সিআইডির সন্দেহ, একাধিক দলিলে বিক্রেতা হিসেবে ভুয়ো ব্যক্তি ও কাল্পনিক ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল। কারণ, দলিলে থাকা অনেক বিক্রেতাকে তাঁদের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁদের অনেককে চিনতে পারেননি। তদন্তকারীদের অনুমান, জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি হাতবদলের জন্য পরিকল্পিত ভাবেই ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল।
অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই জমিতে চাষাবাদ করতেন। ২০২১ সালের পর তাঁদের জোর করে জমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই জমি দখল এবং হাতবদলের প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি।
চার্জশিটে আরও বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছে সিআইডি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে সুমিত রায়ের অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় সাত কোটি টাকা জমা পড়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই বিপুল টাকার উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি বলে দাবি তদন্তকারীদের।
এদিকে, সুমিতকে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও তুলেছিল রাজ্য। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট থেকে রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন অভিষেকের আপ্তসহায়ক। কিন্তু আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর তিনি বার বার এড়িয়ে যাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত সেই রক্ষাকবচ বাতিল করে।
এর পরেই অভিষেকের কালীঘাটের বাড়ি থেকে সুমিতকে গ্রেফতার করে সিআইডি। বর্তমানে তিনি তদন্তকারীদের হেফাজতে রয়েছেন। শালবনির জমি দুর্নীতির ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া বয়ান, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল টাকার জমা—তদন্তে এখন এই তিনটি বিষয়ই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
Leave a Comment