---Advertisement---

মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি, হাতবাঁধা ছেলের সামনে শেষযাত্রা! ‘রক্তপলাশ’-এ শ্রীজাতর তীব্র প্রতিবাদ

By kolamkotha.com

September 13, 2026 4:35 PM

মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি, হাতবাঁধা ছেলের সামনে শেষযাত্রা! ‘রক্তপলাশ’-এ শ্রীজাতর তীব্র প্রতিবাদ

---Advertisement---


মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল একটাই—শেষবারের মতো ছেলেকে চোখের সামনে দেখা। কিন্তু সেই ইচ্ছেটুকুও পূরণ হয়নি। কারাবন্দি ছেলের মুখ না দেখেই পৃথিবী ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। মায়ের মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার অনুমতি মিললেও সেখানেও ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। হাতবাঁধা অবস্থায় মায়ের চিতার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ছেলে। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাই এ বার কবিতার ভাষায় তুলে ধরলেন কবি শ্রীজাত।

বাংলাদেশে কারাবন্দি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে আগেই সরব হয়েছিলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এ বার শ্রীজাতর সদ্য লেখা ‘রক্তপলাশ’ কবিতায় ফুটে উঠল সেই ঘটনার অভিঘাত। সরাসরি কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এক মায়ের শেষ ইচ্ছে, এক সন্তানের অসহায়তা এবং ক্ষমতার নির্মমতার ছবি এঁকেই প্রতিবাদের ভাষা খুঁজেছেন কবি।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর গ্রেফতার হন চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। জাতীয় পতাকার অবমাননা-সহ একাধিক অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাবন্দি। সম্প্রতি তাঁর বৃদ্ধা মা সন্ধ্যারানি ধর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ছেলেকে একবার দেখার আকুতি জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই কারণে প্যারোলের আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন মঞ্জুর হয়নি।

এর পর আসে আরও মর্মান্তিক মুহূর্ত। জেলে পৌঁছয় মায়ের মৃত্যুসংবাদ। শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক ঘণ্টার অনুমতি পান চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। মায়ের চিতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সন্ন্যাসীর চোখের জল এবং হাতবাঁধা অবস্থার ছবি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। একদিকে মায়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে জীবিত সন্তানের অসহায় উপস্থিতি—দৃশ্যটি স্বাভাবিক ভাবেই নাড়া দেয় বহু মানুষকে।

সেই যন্ত্রণাকেই ‘রক্তপলাশ’-এ শব্দ দিয়েছেন শ্রীজাত। মায়ের শেষ ইচ্ছে অপূর্ণ থাকার বেদনা থেকেই কবিতার ভাষা ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্মমতার প্রশ্নে। কবির কলমে উঠে আসে এক সরল অথচ তীব্র প্রশ্ন—একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ চাওয়াটুকুও কি এত বড় অপরাধ?

‘রক্তপলাশ’ কবিতায় শাসকের অন্ধ বিদ্বেষকে নিশানা করে তিনি লিখেছেন—

‘‘এই পৃথিবী ছাড়ার আগে
সন্তানকে চোখের দেখা।
এর চে’ বেশি মা’র কী লাগে?
কিন্তু মা সেই গেলেন একা।
লাগামবিহীন ঘৃণার বিষে
শেষ ইচ্ছেটাও ছাড় পেলো না…’’

কবিতার এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই যেন ধরা পড়ে গোটা ঘটনার নির্মমতা। মায়ের শেষ আকাঙ্ক্ষা, সন্তানের অসহায় অপেক্ষা এবং ক্ষমতার কঠোরতার মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বকে কয়েকটি শব্দেই সামনে এনে দিয়েছেন কবি।

আরও তীব্র হয়ে ওঠে কবিতার ভাষা যখন আসে মায়ের শেষযাত্রায় বন্দি সন্তানের উপস্থিতির প্রসঙ্গ। মায়ের সামনে দাঁড়িয়েও যেন তাঁর কাছে পৌঁছতে পারেননি ছেলে। শোক প্রকাশের স্বাভাবিক অধিকারটুকুও যেন আটকে ছিল বিধিনিষেধের বেড়াজালে।

শ্রীজাত লিখেছেন—

‘‘ছেলের দু’হাত/বাঁধলো কী হায়/মা ঠিক যখন যাচ্ছিল ঘুম/চোখরাঙানির এই দুনিয়ায়/অশ্রু কেবল সংখ্যালঘু।’’

এই পঙ্‌ক্তিগুলিতে ব্যক্তিগত শোক ছাপিয়ে উঠে এসেছে আরও বড় এক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন। মায়ের মৃত্যুতে সন্তানের কান্না, শেষবার মায়ের মুখ দেখার আকুতি কিংবা শেষযাত্রায় স্বাভাবিক ভাবে পাশে থাকার অধিকার—এসব কি পরিচয়, মত বা রাজনৈতিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে নয়?

এর আগে তসলিমা নাসরিনও এই ঘটনায় বাংলাদেশের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এ বার শ্রীজাতর কবিতা সেই বিতর্ককে অন্য এক মাত্রা দিল। ‘রক্তপলাশ’ শুধু একটি মায়ের মৃত্যু কিংবা একটি পরিবারের শোকের কাহিনি হয়ে থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার সামনে ব্যক্তির অসহায়তা, রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ এবং সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতীক।

মায়ের চোখের জল, সন্তানের কান্না আর রাষ্ট্রের চোখরাঙানি—এই তিনের সংঘাতেই তৈরি হয়েছে ‘রক্তপলাশ’-এর আবহ। শোক থেকে ক্ষোভ, ক্ষোভ থেকে প্রতিবাদ—শেষ পর্যন্ত সেই অশ্রুই যে একদিন আগুনের ভাষা নিতে পারে, কবিতার শেষ সুর যেন সেই বার্তাই দিয়ে যায়।

---Advertisement---

No comments to show.

Leave a Comment